প্রথম পাতা » পরিচিতি

সূর্যোদয়ের দেশ জাপান

দূরপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ জাপান। বর্তমান বিশ্বে জাপান দ্বিতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ। এটি এশিয়ার পূর্ব japan_flagউপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। ছোট বড় অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দেশ। জাপান এশিয়ার মধ্যে সর্বাপেক্ষা শিল্পায়িত দেশ। এটিকে সূর্য উদয়ের দেশ বলা হয়। দেশটির পরিচয় তুলে ধরছেন মো. মাহবুবুর রহমান

ভৌগোলিক উপনাম

সূর্যোদয়ের দেশ, ভূমিকম্পের দেশ, সর্বোচ্চ গড় আয়ুর দেশ, প্রাচ্যের গ্রেট ব্রিটেন ইত্যাদি নামে জাপানকে অবহিত করা হয়। জাপানের ওসাকাকে বলা হয় প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার আর কিটোকে বলা হয় চির বসন্তের নগরী।

ইতিহাস

জাপানের ইতিহাস পৌরাণিক কাহিনীর সাথে জড়িয়ে আছে। কিংবদন্তি মতে সূর্যদেবীর (Sun-Goddess) বংশধর সম্রাট জিম্মু খ্রী:পূর্ব ৬৬০ অব্দে জাপান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৫ম শতকে ইয়ামাতোজাতি কর্তৃক এই রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শতকে। জাপান বিপুলভাবে চীনা সংস্কৃতি গ্রহণ করে। ঐ সময়ে জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন হয়। স্থানীয় শিনটো ধর্মের দ্বারা বৌদ্ধ ধর্ম তথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ১৬০৩-১৮৬৭ পর্যন্ত জাপান শোগুন পরিবার কর্তৃক শাসিত হয়। শোগুন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ১৬শ’ শতকের ডিকটেটার নবুনাগা থহীদেইওশীর স্থলাভিষিক্ত হন। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ অক্টোবর শেষ শোগুন তেকুগুওয়া কেইকোর কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন সম্রাট মেইজী এবং মেইজী বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশ্চাত্যকরণ নীতি গ্রহণ করে জাপান দ্রুত আধুনিক শিল্প রাষ্ট্র ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ (১৮৯৪-৯৫) ও রুশ-জাপান যুদ্ধ (১৯০৪-০৫) বিজয়ের ফলে জাপান বিশ্ব শক্তিরুপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯১০ খ্রিঃ জাপান কোরিয়া দখল করে। ১৯৩১ খ্রিঃ চীনের মাঞ্চুরিয়া অধিকার করে তথায় তাবেদার মানচুকু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪০ সালে জাপান জার্মান ও ইতালির সাথে চুক্তি সম্পাদন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ এর ২ সেপ্টেম্বর জাপান Allience বা মিত্রশক্তির নিকট বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৪৬ সালে নিম্ন পরিষদের প্রাধান্য ও নারীদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। ১৯৫১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে সানফ্রান্সিসকো শহরে জাপান ৪৮টি দেশের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৫২ সালের ২৮ এপ্রিল জাপান সার্বভৌমত্ব ফিরে পায়। ১৯৫৫ সালে লিবার‌্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (LDP) সরকারে প্রাধান্য লাভ করে। ১৮ ডিসেম্বরে ১৯৫৬ সালে জাপান জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৫৮ সালে ব্যাপক সমালোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র জাপান হতে স্থলবাহিনী প্রত্যাহার করে। ১৯৬০ সালে জাপানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক চুক্তি হলে ছাত্রমহলে প্রবল বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। জাপান ১৯৫২ সালে তাইওয়ান ও ভারত, ১৯৫৪ সালে বার্মা, ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ফিলিপাইন, ১৯৫৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে কোরিয়া শাখালিনে দক্ষিণ অংশ, কুরিল দ্বীপপুঞ্জ, ফরমোসা, পেসকাডোর দ্বীপপুঞ্জ, বনিন দ্বীপপুঞ্জ, চীনের গোয়ান ডং প্রদেশের কিছু স্থান, ক্যারোলিন দ্বীপপুঞ্জ, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ জাপানের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ভৌগোলিক অবস্থান ও আয়তন

ভৌগোলিক দিক থেকে যে সব রাষ্ট্রের পরিসর পৃথক বা খণ্ড-বিখণ্ডিত হয় সেসব রাষ্ট্রকে খণ্ডিত রাষ্ট্র বলে। জাপান একটি খণ্ডিত রাষ্ট্র। এর আয়তন ৩,৭৭,৭৬৫ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে আছে লা পারোস প্রণালী ও ওখটস্ক সাগর, পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ফিলিপাইন সাগর আর পশ্চিমে জাপান সাগর। এতে ছোট বড় প্রায় ৪ হাজার দ্বীপ আছে। মূল জাপানের প্রধান দ্বীপ চারটি। হোক্কাইডো (৮৩,৪০৮ বর্গ কি.মি.) হনশু (২১,৪১৩ বর্গ কি.মি.) কিউশু (৪২,১৪৪ বর্গ কি.মি.) ও শিকোকু ১৮,৭৯৫ বর্গ কি.মি.।

জনসংখ্যা

জাপানের জনসংখ্যা ১২ কোটি ৭৯ লক্ষ। লোকসংখ্যায় জাপানের অবস্থান বিশ্বে দশম। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ০.২৪। প্রতিবর্গ কি.মি. -এ ৩০৪ জন লোক বসবাস করে। বিশ্বের জনবহুল শহরের তালিকায় টোকিওর অবস্থান প্রথম। টোকিওতে ২ কোটি ৬৪ লাখ লোক বাস করে। জাপানীদের গড় আয়ু ৮২.৩ বছর।

পার্লামেন্ট বা আইনসভা

জাপানের পার্লামেন্টের নাম ডায়েট। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর হাতেই সর্বময় ক্ষমতা অর্পিত, যিনি ডায়েট কর্তৃক নির্বাচিত হন। ডায়েটের আসন সংখ্যা ৪৮০টি। ডায়েটের সদস্যরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ৪ বৎসরের জন্য নির্বাচিত হন। এরা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ নামে পরিচিত। আবার উচ্চ কক্ষে রয়েছে ২৪২টি আসন। এটি হাউজ অব কাউন্সিলর নামে পরিচিত। ১৯৫৫ সাল থেকে লিবার‌্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জাপানের ক্ষমতায় রয়েছে।

অর্থনীতি

জাপানের মুদ্রার নাম ইয়েন। ১৮৬৮ সালের মেইজী সময়কাল থেকে জাপানের অর্থনীতির সম্প্রসারণ শুরু হয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সাল -এ সময়টিকে জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক যাদুকরী সময় বলা হয়। ১৯৬০ এর দশকে ১০ ভাগ, ৭০ এর দশকে ৫ ভাগ এবং ১৯৮০ এর দশকে ৪ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। ১৯৯০-২০০০ সাল পর্যন্ত জাপানের প্রবৃদ্ধিতে ধ্বস নামলেও ২০০৫ এর পর জাপান তা পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বর্তমান বিশ্বে জাপান দ্বিতীয় সম্পদশালী দেশ। জিডিপির পরিমাণ ৪.৫১ ট্রিলিয়ন ডলার। সূচক ০.৯৫৩। মাথাপিছু জিডিপি ৩১,২৬৭ মার্কিন ডলার। রপ্তানি আয়ের ৯৭ শতাংশ আসে শিল্প খাত থেকে। জাপান তথ্য প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, যন্ত্রাদি, স্টীল, জাহাজ, ক্যামিকেল, টেক্সটাইল এবং খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের যে কোনো দেশের চাইতে এগিয়ে আছে। বিশ্বের বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ টোকিওতে অবস্থিত। জাপানের কেন্দ্রিয় ব্যাংকের নাম দি ব্যাংক অব জাপান।

জাপান সঙ্গীত

চীনদেশীয় সঙ্গীতের প্রভাবে জাপানী সঙ্গীত কলা গড়ে ওঠে। জাপানে চার ধরনের সঙ্গীতের প্রচলন আছে। তন্মধ্যে গাগাকু নামক সঙ্গীত ৫ম শতকে চীনদেশ থেকে আনা হয়। ভারত হতে আনীত বৌদ্ধ স্তোত্র সঙ্গীত ৬ষ্ঠ শতক হতে প্রচলিত হয়। বুগাকু নামক নৃত্য সঙ্গীত ৭ম শতকে চীন হতে আনা হয়। জাপানের নিজস্ব সঙ্গীত কানুরা।

জাপানী সাহিত্য

খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকের শেষ দিক পর্যন্ত জাপানের কোনো লিখিত ভাষার অস্তিত্ব ছিল না। ৮ম শতকে চীনা ভাষা নির্দেশক বর্ণমালার সাহায্যে জাপানি তথা ভাষা লেখার একটি বিশিষ্ট পদ্ধতির উদ্ভব হয়। একাদশ শতকে অভিজাত বংশীয়া শ্রীমতি, মুরাসাকি প্রমুখ লেখক-লেখিকাগণ চীনা ভাষার পরিবর্তে জাপানী ভাষায় উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করতে আরম্ভ করেন। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের পর হতে জাপানী সাহিত্য গভীরভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্যে দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। জাপানের কয়েটি উল্লেখযোগ্য কাব্য হল তানকা, হাইকাই বা হোককু। ইয়াসুনারী কাওয়াবাতা (১৯৬৮ নোবেল প্রাপ্ত), কিরো ওসারাগী, এবং ইউকিও মাশিমা প্রমুখ আধুনিক জাপানী লেখকগণ আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন।

ধর্ম

জাপান একটি বৌদ্ধধর্মালম্বী রাষ্ট্র। ৮৫% লোক বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। জাপানে শিনটোবাদও প্রচলিত। মুসলিম ২%। জাপানে খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেরাও বাস করে।
———————————————————————————————–

এক নজরে জাপান

  • রাষ্ট্রীয় নাম – স্টেট অব জাপান।
  • জাতীয় নাম – নিপ্পন কাকু (পুরাতন নাম)
  • শাসন ব্যবস্থা – সাংবিধানিক রাজতন্ত্র
  • প্রধানমন্ত্রীর নাম – তারো আসো।
  • সম্রাটের নাম – আকিহিতো (১২৫তম)।
  • সরকার পদ্ধতি – সংসদীয়।
  • স্বাধীনতা লাভ – ২ এপ্রিল, ১৯৫২।
  • জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ – ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৫৬।
  • আয়তন – ৩,৭৭,৭৬৫ বর্গ কি.মি.।
  • লোকসংখ্যা – ১২ কোটি ৭৯ লক্ষ।
  • জাতীয় ভাষা – জাপানিজ।
  • প্রধান ধর্ম – বৌদ্ধ ও শিন্টোবাদ।
  • মাথাপিছু জিডিপি – ৩১,২৬৭ মার্কিন ডলার।
  • গড় আয়ু – ৮২.৩ বছর।
  • মুদ্রা – ইয়েন, ১ ডলার = ১১৮.৫৯ ইয়েন।
  • শিক্ষার হার – ৯৯%
  • গ্রীনিচ সময় – + ৯ ঘণ্টা।
  • প্রধান সমুদ্র বন্দর – ওসাকা, ইয়োকোহামা।
  • জাতীয় প্রতীক – ক্রিসেন থ্যামাস।
  • পার্লামেন্টের নাম – ডায়েট।
  • প্রধান সংবাদপত্র – আসাহি শিম্বুন।
  • সংবাদ সংস্থা – জিএনএন (GNN), এফপিএস (FPS)।
  • বিমান বন্দর – নারিতা ও হেনেডা।
  • বিমান সংস্থা – জাপান এয়ারলাইন্স (JAL)।
  • বেসামরিক বিমান প্রতীক – JA।
  • জাতীয় খেলা – জুডো।

————————————————————————————————-

জাপান সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্য

  • এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত দেশ জাপান।
  • প্রথম যন্ত্র শিল্পের সূচনাকারী দেশ জাপান।
  • বিশ্বের দীর্ঘতম রেল সুরন্দ তান্না, জাপান।
  • জি-৮ ভুক্ত এশিয়ার একমাত্র দেশ জাপান।
  • জাপানের জাতীয় শরীরচর্চার নাম যুযুৎসু।
  • আইনু জাপানের আদিবাসী গোষ্ঠী।
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমাতে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট লিটলবয় এবং নাগাসাকিতে ৯ আগস্ট ফ্যাটম্যান নামক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।
  • ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ জাপান ইবুকি নামে বিশ্বের প্রথম গ্রীন হাউস নিরীক্ষণকারী উপগ্রহ মহাশূন্যে নিক্ষেপ করে।
  • জাপান ১৯৩৭ সালের ৭ জুলাই চীন আক্রমণ করে।
  • জাপানের প্রথম মহিলা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম মাকিকো তানাকা।
  • জাপান ১৯৩২ সালের ২৮ জানুয়ারি সাংহাই অধিকার করে।
  • জাপানের বর্তমান সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৪৭ সালে।
  • জাপানে সামন্ত ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে ১৮৭১ সালে।
  • জাপান তাইওয়ান দখল করে ১৯৯৫ সালে।
  • চীন জাপান থেকে তাইওয়ান পুনরুদ্ধার করে ১৯৪৫ সালে।
  • কুরিল ও শাখালিন দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার বিরোধ চলছে।
  • জাপানের সম্রাটের উপাধি মিকার্ডো।

2 টি মন্তব্য »

  • Md. Zillur Rahman বলেছেনঃ

    জাপান সম্পকির্ত অারও কিছু তথে্য্য উল্লেখ অাছে জাপান তাইয়ান দখল করে নেয় ১৯৯৫ সালে। চীন জাপান থেকে তাইয়ানকে পুনরুদ্ধার করে ১৯৪৫ সালে। উক্ত লাইন দুটি সংগতি পূর্ন নয় বেল মনে হয়। ধন্যবাদ

  • atikul haque বলেছেনঃ

    i like this…

এই লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন!

এখানে আপনি মন্তব্য করতে পারেন অথবা আপনার সাইট থেকেই ট্র্যাকব্যাক করতে পারেন। এছাড়াও আপনি আরএসএস এর মাধ্যমে কমেন্ট ফিড পেতে পারেন।

দয়া করে মন্তব্য করার সময় প্রাসঙ্গিক থাকুন।

মন্তব্য করার জন্য আপনি নিন্মোক্ত ট্যাগগুলো ব্যবহার করতে পারেন:
<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

এই সাইটটি গ্রাভাটার-এনাবল্ড। . আপনার এভাটার পেতে রেজিস্টার করুনগ্র্যাভাটার ডট কম-এ.