শিশুশ্রম, শিশুকল্যাণ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে পালিত হল দিবসটি। বিশ্বে বিশেষ করে
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুশ্রম অন্যতম একটি প্রধান জাতীয় সমস্যা। ক্রমেই এটি মারাত্মক রূপ লাভ করছে। সুন্দর এ পৃথিবী একটি বিশালসংখ্যক মানবশিশুর বিকাশের জন্য হয়ে উঠছে মারাত্মক হুমকি। শিশুশ্রমের ভয়াবহতা, প্রকৃতি, নিরোধসহ শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও পর্যাপ্ততা প্রভৃতি দিক সম্বন্ধে লিখেছেন এইচ. এম দিদার।
শিশু
জাতিসংঘের আইনানুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সকল মানবসন্তান শিশু হিসেবে গণ্য হবে। আবার বাংলাদেশ শিশু আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী ১৬ বছরের কমবয়স্করা শিশু। উল্লেখ্য স্থানভেদে শিশুদের বয়সের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়।
শিশুশ্রম
অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা জাতিসংঘ ঘোষিত বয়স অনুযায়ী যারা শিশু, তাদের দ্বারা সংঘঠিত শ্রমই শিশুশ্রম যা শিশুর সামগ্রিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে ।
শিশুশ্রমের কারণ
২০০৭ সালে ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় ‘শতকরা ৭৫ ভাগ শিশুশ্রমের মূল কারণ পরিবারের আর্থিক অনটন’। তাছাড়া ‘চাইল্ড ওয়েলফেয়ার অ্যাক্টিভিটিজ ইন এশিয়া’ নামক গ্রন্থে অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা এবং দারিদ্র্যকে শিশুশ্রমের মূল অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উল্লেখ্য, আর্থিক কারণের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশ, নিরক্ষরতা, পিতামাতার অর্থলোভী মানসিকতা প্রভৃতি কারণে শিশুশ্রমের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
শিশুশ্রম ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ (ক) ধারায় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের জন্য মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৭ (ক) ধারায় বলা হয়েছে আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল শিশুকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। অর্থাৎ উল্লেখিত ধারা দুটির মাধ্যমে প্রথমত মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত শিশুদের জন্য শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাছাড়া ১৯৭৪ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়স্ক কোন শিশুকে কর্মে নিয়োগদানে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা……..
সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, আইনগত বাধ্যবাধকতা সব কিছু আজ স্লোগানসর্বস্ব ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’- এ স্লোগান আজ শুধু সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ। একটু পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা লক্ষ্য করব যে, বাংলাদেশে শিশুশ্রমের ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের চারপাশে অহরহ শিশুশ্রমের মারাত্মক চিত্র প্রত্যক্ষ করছি। যদিও এদেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী তা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের মত । এদের অধিকাংশই প্রধানত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয়, জেলা এবং থানা শহরগুলোতে ও গ্রামীণ কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করছে। জীবন-সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য শ্রম বিক্রির মাধ্যমে এরা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছে কঠিন শ্রম যা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের প্রায় ৩৫ ভাগ শিশু এখনও পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হতে বঞ্চিত। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর ঝরে পড়ার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য হারে বিদ্যমান। শিশুশ্রমিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রয়েছে ছিন্নমূল শিশু এবং এদের মধ্যে ৫০ শতাংশের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাই জীবন রক্ষার্থে তারা প্রতিদিন যোগদান করছে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে।
শিশুকল্যাণ
শিশুকল্যাণ বলতে বুঝায় সাধারণত সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকর্তৃক গৃহীত সেসব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও দৈহিক কার্যক্রমের সমষ্টিকে যেগুলো শিশুর দৈহিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মানসিক, আবেগীয় উন্নতিসহ সামগ্রিক কল্যাণে সহায়তা করে।
বাংলাদেশে শিশুকল্যাণ কর্মসূচি
শিশুকল্যাণমূলক কার্যক্রম আমাদের দেশে বহু পূর্বেই শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে শিশুদের পরিবর্তিত, নতুন উদ্ভূত প্রয়োজন ও চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম গৃহীত হয়। নিম্নে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি শিশুকল্যাণ কর্মসূচি উল্লেখ করা হল-
১. শিশু সদন
১৯৪৪ সালের ‘বঙ্গীয় এতিম ও বিধবা সদন’ আইন অনুযায়ী সরকারি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা হয়। এবং ১৯৮১ সালে এগুলোর নাম পরিবর্তন করে শিশু সদন ও শিশু পরিবার করা হয় যেখানে শিশুদের লালন পালনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
২. বেবি হোম
১৯৬২ সালে (০-৫) বছর বয়সী শিশুদের লালন পালনের জন্য ঢাকার আজিমপুরে সর্বপ্রথম বেবি হোম প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সারাদেশে ৬টি বেবি হোম রয়েছে।
৩. ডে কেয়ার সেন্টার
নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মহিলাদের শিশুকে (৫-৯ বছর) মায়ের অনুপস্থিতি দিবাকালীন রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে আজিমপুরে (ঢাকা) সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ডে কেয়ার সেন্টার।
৪. দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পূণর্বাসন কেন্দ্র
১৯৮১ সালে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও গোপালগঞ্জে আরো ২টি কেন্দ্র চালু হয়েছে।
৫. প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
এর মাধ্যমে শিশুদেরকে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। এতিমদের উচ্চতর পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক প্রশিক্ষণের জন্য এ ধরনের ৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বাংলাদেশে।
৬. প্রতিবন্ধী শিশুকল্যাণ কার্যক্রম
এক্ষেত্রে অন্ধ, মূক ও বধির স্কুল সমন্বিত অন্ধশিক্ষা, জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কেন্দ্র (টঙ্গী), জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র (মিরপুর), বেইল প্রেস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি চালু রয়েছে।
৭ . কিশোর ও কিশোরী অপরাধ সংশোধন কার্যক্রম
এ কার্যক্রমের মধ্যে কিশোর আদালত, কিশোর হাজত, রিমান্ড হোম, সংশোধনী প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য।
৮ . মাতৃমঙ্গল ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র
৬৪ জেলা সদরে এ ধরণের ৬৪টি কেন্দ্র রয়েছে।









আপনার পক্ষে যদি প্রতিদিন এই সাইটে আসা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি আমাদের
এই লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন!