বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ২০০৯
নানা বিতর্ক জটিলতা আর অচলাবস্থা শেষে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে ‘কোপেনহেগেন অঙ্গীকারনামা’ (কোপেনহেগেন অ্যাকর্ড) উত্থাপন করে। ৭ ডিসেম্বর শুরু হওয়া জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেওয়া ১৯৩ দেশের মধ্যে ১৮৯টি দেশ এই অঙ্গীকারনামাকে একটি নোট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিন পৃষ্ঠার অঙ্গীকারনামার ১২টি শর্ত বাংলাদেশ অনুমোদন দিয়েছে।
সম্মেলনে তিন দিনের অচলাবস্থা চলার পর থেকে ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশসহ ২৫টি দেশ মিলে কোপেনহেগেন অঙ্গীকারনামার খসড়া তৈরি করে। বাংলাদেশ সময় ১৯ ডিসেম্বর সম্মেলনের নীতিনির্ধারণী পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়। চারটি ছাড়া বাকি সব দেশ তাৎক্ষণিকভাবে তা অনুমোদন করে।
সুদান, বলিভিয়া, নিকারাগুয়া, ব্রাজিল ও কিউবা এই অঙ্গীকারনামায় সই না করায় এখনো তা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। সবার সম্মতি পেলেই এটি একটি আইনগত বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তি হিসেবে অনুমোদন পাবে। ইউএনএফসিসি আগামী এক বছর অঙ্গীকারনামার খুঁটিনাটি বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর তা চূড়ান্ত করবে।
এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত হবে উল্লেখ করে জাতিসংঘ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে একটি আইনগত বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তির জন্য এখন থেকেই জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক (ইউএনএফসিসি) কাজ করবে। ২০১০ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত কোপ-১৫ সম্মেলনে এ চুক্তি সই হবে বলে আশা করছে জাতিসংঘ।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পরিকল্পনা ও চুক্তিনামা তৈরির জন্য কাজ করা বালি অ্যাকশন প্ল্যানবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ-২ ও কিয়োটো প্রটোকলবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ-১-এর কার্যক্রম আরও এক বছর বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অঙ্গীকারনামায় কী আছে: অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশে¡র তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
জাতিসংঘের আন্ত:সরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশে¡র গড় তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দিলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। এতে বেশির ভাগ ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ডুবে যাবে।
খসড়ায় ২০১০-১২ সালের জন্য তিন হাজার কোটি ডলারের একটি তহবিলের কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু তহবিলের অর্থ বনায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা অর্জনে ব্যয় হবে। ফলে এই তহবিলের অর্থ দরিদ্র দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলো যেমন চীন, ভারত, ব্রাজিলও পাবে। এমভিসি (সর্বাধিক ঝুঁকিপ্রবণ) দেশগুলোর পক্ষে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মোট বার্ষিক প্রবৃদ্ধির দেড় শতাংশ চাওয়া হলেও তা পাওয়ার ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা মেলেনি। ইউএনএফসিসি থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক হাজার কোটি ডলার ও ২০২০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু সম্মেলনে ব্যবহৃত কারিগরি শব্দগুলোর পরিচয়
অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) : নিঃসন্দেহে জলবায়ু ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যা যা করা হচ্ছে যেমন- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবেলা করার জন্য বাঁধ নির্মাণ অথবা উচ্চ তাপমাত্রা বা খরা সহনীয় জাতের শস্য উদ্ভাবন ও তার চাষাবাদ।
অ্যানথ্রোপোজেনিক (মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন) : স¡াভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে মানুষের কার্যকলাপের জন্য (যেমন তেল পুড়িয়ে কার্বন নিঃসরণ) যে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে।
অভিযোজন তহবিল : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাহায্যের জন্য গঠিত তহবিল। কিন্তু ডেভেলপমেন্ট মেকানিজমের মতো নিঃসরণ হ্রাস কর্মসূচি থেকে পাওয়া অর্থ এ তহবিলের অন্যতম উৎস।
অ্যানেক্স-১ দেশগুলো : শিল্পায়িত দেশগুলো (এবং যেসব দেশ বাজার অর্থনীতির পথে যাওয়ার ক্রান্তিলগ্নে) যারা কিয়োটো প্রটোকল অনুযায়ী নিজ নিজ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছিল।
অ্যানেক্স-২ দেশগুলো : কিয়োটো প্রটোকল অনুযায়ী যেসব উন্নত দেশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিশেষ দায়দায়িত্ব বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ গ্রুপটি অ্যানেক্স-১ এরই একটি উপশাখা, তবে এর মধ্যে যারা ১৯৯২ সালে কেন্দ্রিয়ভাবে পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে যাত্রা করেছিল সেসব দেশ নেই।
অ্যানেক্স-১ বহির্ভূত দেশ : কিয়োটো প্রটোকল স¡াক্ষর ও অনুমোদনকারী উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাদের জন্য বাধ্যতামূলক কার্বন নিঃসরণ হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা নেই।
বালি অ্যাকশন প্ল্যান: ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে প্রস্তুত পরিকল্পনা। এটি বালি রোডম্যাপের একটি অংশ। ওই অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস, অভিযোজন, অর্থায়ন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার একটি অভিন্ন রূপকল্প তৈরি ছিল ওই ওয়ার্কিং গ্রুপের দায়িত্ব।
বালি রোডম্যাপ : বালিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য ছিল কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আরো হ্রাস করতে ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে একটি ঐক্যমতে পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করা।
এ রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় দুটি ওয়ার্কিং গ্রুপকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। একটি গ্রুপের কাজ ছিল বালি অ্যাকশন প্ল্যানের বাস্তবায়ন দেখা। অন্যটির দায়িত্ব ছিল ২০১২ সালের পর অ্যানেক্স-১ দেশগুলোর প্রস্তাবিত নিঃসরণ হ্রাস নিয়ে আলোচনা করা।
ইউএনএফসিসি : ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওডি জেনিরোতে আয়োজিত ধরিত্রী শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত বিশে¡র পরিবেশবিষয়ক একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক চুক্তির অন্যতম।
জলবায়ু ব্যবস্থায় মানুষের ‘বিপজ্জনক’ হস্তক্ষেপ বন্ধ করাই ইউএনএফসিসির লক্ষ্য। ১৯৯৪ সালের ২১ মার্চ এটি কার্যকর হয় এবং ১৯২টি দেশ এটি অনুমোদন করেছে।
কিয়োটো প্রটোকল : জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক?াইমেট চেঞ্জের (ইউএনএফসিসি) সঙ্গে যুক্ত একটি প্রটোকল। ওই ফ্রেমওয়ার্কে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এতে শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের সম্মিলিত নিঃসরণের পরিমাণ ২০০৮ থেকে ২০১২-এ পাঁচ বছরে ১৯৯০ সালের পর্যায় থেকে ৫.২ শতাংশ কমিয়ে আনতে সম্মত হয়েছিল।
বিশে¡র সরকারগুলো ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটোতে এক জাতিসংঘ সম্মেলনে এ ব্যাপারে সম্মত হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের আগে তা আইনগতভাবে অবশ্যপালনীয় হতে পারেনি।
গ্রিনহাউস গ্যাস : প্রাকৃতিক ও শিল্প থেকে নিঃসৃত গ্যাস যা ভূপষ্ঠের তাপ আটকে রেখে উষ্ণতা বাড়িয়ে তোলে। কিয়োটো প্রটোকলে ৬ ধরনের গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিকগুলো হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মিথেন। শিল্প থেকে মানুষের সৃষ্টগুলো হচ্ছে পারফ?ুওরোকার্বন্স, হাইড্রোফ্লুওরোকার্বন্স ও সালফার হেক্সাফ্লুওরাইড।
কাচের ঘরের যে আচ্ছাদনের ভেতর কৃত্রিম উষ্ণতা ও আলো ধরে রেখে কিছু বিশেষ উদ্ভিদ চাষ করা হয় তাকে বলে গ্রিনহাউস। এর সঙ্গে মিল রেখে এ প্রক্রিয়ার নামকরণ হয়েছে ‘গ্রিনহাউস এফেক্ট’। কারণ ওই গ্যাসগুলো যেন তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলে পৃথিবীকে ওরকম উষ্ণ কাচের ঘর বানিয়ে তুলছে।
কার্বন ফুটপ্রিন্ট : একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের সময় নিঃসরণের পরিমাণকেও কার্বন ফুটপ্রিন্ট বলা হয়।
কার্বন অফসেটিং : বায়ুম ল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড কমিয়ে ফেলার প্রচেষ্টায় অংশ নিয়ে বা অর্থ জুগিয়ে নিজের নিঃসরণের ক্ষতিপূরণের একটি ব্যবস্থা। অনেক সময় কার্বন অফসেটিং প্রক্রিয়ার আওতায় নিজের নিঃসৃত কার্বনের সমপরিমাণ নিঃসরণ ঠেকাতে অন্যত্র অন্য কোনো পক্ষকে অর্থ দেওয়া হয়।
এমিশন (নিঃসরণ) ট্রেডিং স্কিম : গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সরকারগুলোর মধ্যে নিঃসরণ পারমিট বেচাকেনার জন্য চালু করা একটি স্কিম বা প্রকল। সবচেয়ে ভালো প্রকল্প হিসেবে দেখা হয় ২০০৫ সালে চালু হওয়া ইইউর স্কিমটি।
ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম) : কিয়োটো প্রটোকলের আওতায় একটি কর্মসূচি। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস বা দূর করায় বিনিয়োগ করে উন্নত দেশ বা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ ক্রেডিট’ পেতে পারে।
টিপিং পয়েন্ট : টিপিং পয়েন্ট হচ্ছে পরিবর্তনের একটি পর্যায়। সেখানে পৌঁছে গেলে এমন এক প্রক্রিয়ার সূচনা হবে যেখান থেকে আরো পেছনে ফেরা মুশকিল।









আপনার পক্ষে যদি প্রতিদিন এই সাইটে আসা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি আমাদের
এই লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন!