বাংলাদেশে রাজনীতির বোরো ক্ষেতে চমকের চাষ
এহ্সানুল হক খান আশিষ
বেশি দিন আগের কথা নয় সংস্কারের মোড়কে আবৃত ওয়ান
ইলেভেন নামক দানব ষাড় ঢুকে পড়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির বোরো ক্ষেতে। ঢুকে পড়ার সঙ্গত কারণও (তাদের ভাষায়) ছিল। কারণটি সেই পুরোনো, চেনাজানা বোরো ক্ষেতের পোকামাকড় দমন। দানব ষাড় দিয়ে পোকামাকড় দমন কতটুকু সম্ভব বা আদৌ সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখার সময় ও সুযোগ বোদ্ধাজনদেরকে দেয়া হয়নি।
ফলে যা হবার তাই হল। দানব ষাড় সবুজ ক্ষেত চিবোতে চিবোতে তে চাষীদেরকে (রাজনীতিবিদ) বললেন, তোমরা অযোগ্য চাষী, তোমরা জাননা চাষাবাদ কীভাবে করতে হয়, তোমরা এতবছর জমিকে খামাখা কষ্ট দিয়েছ। তোমরা অযোগ্য, অদক্ষ, অসৎ! শুধু একথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি ষাড়গুলো, তারা শাস্তিসরূপ চাষীদের গায়ে গোবরের ছিটা এবং পাছায় লেজের বাড়ি দিতেও ভুল করেনি।
এরই মধ্যে পুরো ক্ষেত সাবাড়। দানব ষাড়ের পায়ের নিচে পিষে মারা পড়লো গুটি কয়েক পোকা মাকড়ও। ষাড়ের গোবর (উৎকৃষ্ট মানের দেশীয় সার) বিনা পয়সায় ক্ষেতে দেওয়া আছে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরবর্তীতে ভালভাবে চাষাবাদ করার পরামর্শ এবং পোকামাকড় দমনের নামে বোরোক্ষেত সাবাড়, চাষীদের ইতোপূর্বের অযোগ্যতা ও অসততা, চাষীদের গায়ে গোবর ছিটানো এবং পাছায় লেজের বাড়ি দেওয়ার বৈধতা যেসকল চাষী দিতে পেরেছে সেই সব চাষীর হাতে তে বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছে দানব ষাড়।
এই হল বাংলাদেশের রাজনীতির বোরো ক্ষেত চলতি পাঁচ বছরের জন্য ইজারা নেবার সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত।
এদিকে নতুন ইজারাদার প্রধান চাষী ওবামা কায়দায় পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ভালমত চাষাবাদ করার লক্ষ্যে (আন্তরিকতার কোন অভাব সম্ভবত নেই) রীতি অনুযায়ী একদল চাষী তৈরি করবেন যেখানে চমক থাকবে বলে তিনি জানান। জনগণ সত্যিই চমকিত হয়। কেননা, পুরোনো দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পরিচিত অনেক চাষীকে বাদ দিয়ে প্রায় সম্পূর্ণ নতুন, অদক্ষ, অনভিজ্ঞ, অপরিচিত, বাক সর্বস্ব ও হামবড়া টাইপ একদল চাষীর তালিকা তিনি প্রকাশ করেন এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন করেন।
জনগণ অনেক বেশি চমকিত হল উক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত চাষীদের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে নানা মন্তব্যে। দায়িত্ব গ্রহণ করবার সাথে সাথেই উক্ত চাষীদের অনুসারী ক্ষেত মজুরেরা সারাদেশের ক্ষেত খামার, নালা-ডোবা সব কিছুতেই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকে, ভিন্ন মতাবলম্বী (বৈধতা না দেয়া চাষী) চাষীদেরকে আহত- নিহত করতে থাকে। যা বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় নিয়মিত আসতে থাকে। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত চাষী এ প্রসঙ্গে বললেন, এটা তাদের (বৈধতা না দেওয়া চাষী) অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব।
দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী চাষী উনি হলেন আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চমক। ওনাকে টিভির পর্দায় দেখলেই ওনার পূর্বসূরীর কথা মনে পড়ে যায়। মাথায় জেল মেখে বাংলিশ ভাষা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ” টাইপ কথা বললেও জেল মাখা পূর্বসূরী মন্তব্য করতেন সংক্ষিপ্ত। আর উত্তরসূরীও মাথায় জেল মাখাকে অনুসরণ করে এবং মাথা ঝাকিয়ে সংক্ষিপ্ত’র পরিবর্তে বিশ্লেষণে গিয়ে বাংলিশের পরিবর্তে ইংলিশে বলে মূর্খ (!) বাঙ্গালির জন্যে এই বিলেতি ভাষার অনুবাদকের মহান দায়িত্বও মিডিয়ার সামনে জাহির করতে ভালবাসেন।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রাপ্ত যিনি শিল্প বিষয় দেখাশোনা করছেন। অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী এই চাষী সারা জীবন প্রাকটিক্যালী চাষাবাদ করবার বদলে শুধু পড়াশোনাই করেছেন। অ্যামেচার চাষী হয়েও তিনি আজীবন পেশাদারী চাষার মনোভাব লালন করেন। এই মহান চাষী বিশ্বব্যপী অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশে কোন প্রভাব ফেলবে না বলে মন্তব্য করেন এবং যুক্তি দেখান যে, “বাংলাদেশের শ্রম বাজার সস্তা তাই পশ্চিমা দেশগুলোকে বাংলাদেশ থেকেই পোষাক কিনতে হবে”।
এটাকে আহাম্মকি বলবার ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না শুধু মাত্র বিনয়ের সাথে বলতে চাই, পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের ইজারা নেওয়া প্রধান চাষীর সাথে চীন সফরে যাবার অপরাধে জোটের পদ হারিয়েছিলেন, এখন কি মন্ত্রীত্ব হারাবার ভয়ে এসব গোজামিল দেওয়া বক্তব্য দিচ্ছেন নাকি মন্ত্রী হবার পর আপনার অতীতের সব জ্ঞান তাত্ত্বিক পড়াশোনা কর্পূরের মত উবে গেছে ?
পশ্চিমা দেশগুলো কি বাংলাদেশ থেকে পোষাক কিনে নাকি লন্ড্রি-দর্জির কাজ করায়? মাননীয় মন্ত্রী আপনার কি জানা নেই যে, পশ্চিমারা আমাদের দেশে কাপড়, সুতা, বোতাম, কাটিং ম্যাশিন, সেলাই ম্যাশিন, পলি ব্যাগ, কার্টন ম্যাশিন, লন্ড্রি ম্যাশিন সহ যাবতীয় ইকুইপমেন্টস্ এমন কি মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা স্টিকারও পশ্চিম থেকে আসে। আর এই পশ্চিমা আগমনের ফলে আমাদের দেশের কাপড় কল, সুতার মিলসহ অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে শুধু মাত্র শ্রমনির্ভর গার্মেন্ট শিল্প তৈরি হয়েছে যা এখন কোটামুক্ত বিশ্ববাজারে প্রবেশ করেছে।
পশ্চিমারা বাংলাদেশ থেকে কোন পোষাক কেনেনা বরং বাংলাদেশ তাদের কাপড়ের একটা বিরাট বাজার। মুক্তবাজার অর্থনীতির ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এদেশে তারা কাপড় বেচে। মাঝখানে শ্রম সস্তা হবার দরুন তাদের ব্যবহারের কাপড়টাও তারা বাংলাদেশ থেকে কেটে সেলাই-ইস্ত্রি করিয়ে নেয়। বিনিময়ে বাংলাদেশের মজুরদেরকে মজুরী দিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চাষী যার রয়েছে প্রাক্টিক্যালী চাষাবাদের বিস্তর অভিজ্ঞতা। দ্রব্য মূল্যের নাট টাইট দিতে তাকে বসানো হয়েছে বাণিজ্য শাখায়। দ্রব্যমূল্যের নাট টাইট দিতে দিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জঘন্য দুর্ঘটনা ঘটে গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায়। ইজাদার প্রধান চাষীসহ সংশ্লিষ্ট চাষী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চাষীদের দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতার দরুণ অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায় দেশের।
পিলখানাসংশ্লিষ্ট চাষীর অযোগ্যতার দরুণ দ্রব্যমূল্যের নাট টাইট দেওয়া চাষীর কাধে অতিরিক্ত দায়িত্ব বর্তালো পিলখানা ট্র্যাজেডি তদন্তের সমন্বয়কের। মিডিয়ায় বেশ ফটর-ফটর করবার একটা সুযোগ এলো। অব্যাহতও থাকলো তা। হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো, “এ ঘটনার সাথে জঙ্গী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে”।
উনি একবারও ভাবলেন না যে, দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মত একটা গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী যারা প্রতিনিয়ত সীমান্তে যুদ্ধ করে দেশকে বহিঃশত্রু থেকে নিরাপদ রাখছে, যাদেরকে রিক্রুট করছে সরাসরি সেনা কর্মকর্তাগণ তাদের মধ্যে জঙ্গি ঢুকলো কিভাবে ? অথবা সীমান্ত রক্ষীদের মধ্যে যদি জঙ্গী ঢুকতে পারে তাহলেতো সে দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যেও জঙ্গী থাকতে পারে। আর এই জুজুর (জঙ্গী) ভয়ে জাতিসংঘ যদি তার মিশন থেকে বাংলাদেশী সৈন্য ফেরত পাঠায় অথাবা নেয়া বন্ধ করে দেয় সেটা কি খুবই অযৌক্তিক হবে, তা কি দেশের জন্যে শুভ ফলদায়ক হবে ? তাই বলছি দয়া করে এই চমকের মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন। দেশবাসীকে আর চমক দেখাবার দরকার নেই।
আরেকজন মাননীয় চাষী ওনার দায়িত্ব হল সারা বিশ্বের চাষাবাদের সাথে বাংলাদেশের চাষাবাদকে সম্পর্কযুক্ত করা। উনিও কম চমক নন, কম চমকিতও করেননি দেশবাসীকে। অনেক রক্ত, ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এই স্বাধীন ভূ-খন্ডকে “বাফার স্টেট” বলে গেলেন জনৈক দাদা। তাও আবার এই দেশের মাটিতে দাড়িয়ে। বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করলেন না মাননীয় চাষী। মুখ বুজে সয়ে গেলেন দাদার দাদাগিরি। কারণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রথম পাঠ “বাফার স্টেট’ কি তা তিনি জানেন না।
মনে পড়ে যায়, বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন ও মরহুম চাষীর কথা। লন্ডন প্রবাসী জনৈক শফীক সাহেব ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার লুটে নিয়ে গেল আর এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চাষী বললেন, “শেয়ার বাজার কি তা আমি বুঝি না”। যাহোক আশার কথা হল উক্ত বিষয়ে এবার কার দায়িত্ব প্রাপ্ত চাষী অত্যন্ত অভিজ্ঞজন, যিনি স্বৈরাচারী চাষীর আমলেও একই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অভিজ্ঞতার বিশাল ভান্ডার নিয়ে তিনি বলেছেন,“শেয়ার বাজারকে অস্থিতিশীল হতে দেওয়া যাবে না”।
সাবাস ! একটা নিশ্চয়তা অন্ততঃ পেল দেশবাসী।
অভিজ্ঞদের দূরে সরিয়ে রাখলেও উক্ত অভিজ্ঞ চাষী ছাড়াও আরেকজন অভিজ্ঞ চাষীকে আমরা উপহার পেয়েছি। যিনি মুখে ফটর-ফটর আওয়াজ আপাততঃ করছেন না। তিনিও অভিজ্ঞতার ভারে ভারাক্রান্ত। স্বৈরাচারী চাষীর আমলে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিশাল অভিজ্ঞতা ও গায়ে স্বৈরাচারী গন্ধ রয়েছে তার। এই গন্ধ দূর করবার নিমিত্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিশাল মজমা বসিয়ে সারা দেশে আলোড়িত হন। যুদ্ধাপরাধ ও স্বৈরাচারী যে প্রায় সমপর্যায়ের অপরাধ তা কি তিনি জানেন না; নাকি জেনেও ক্ষমতার মোহে তা চেপে যাচ্ছেন ?
এখন এ প্রশ্ন ওঠা অবান্তর হবে বলে আমার মনে হয় না যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীর যে মজমা তিনি বসিয়েছিলেন তা কি সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে না কি মন্ত্রীত্ব পাবার পথ সুগম করতে? মন্ত্রী হবার পর সে মজমা তাহলে বন্ধ হয়ে গেল কেন ? নাকি এটাও একটা চমক। আর কত চমক আমাদেরকে দেখতে হবে।
মাননীয় প্রধান চাষী তার বক্তৃতা-বিবৃতিতে আগের তুলনায় অনেক সংযত হলেও এখনও মাঝে মধ্যে চকম ছড়াতে কুন্ঠিত হন না। সাম্প্রতিক কালে মহান জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে শহীদ পরিবারকে পুনর্বাসনের নামে আরেক শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদ করবার যে বক্তৃতা তিনি দিয়েছেন তা এক বিশাল চমক হিসাবে তিনি দেখলেও জনগণ এটাকে দেখছেন ক্রিটিসিজম প্র্যাকটিস হিসাবে।
তাই বলছি দয়া করে আর নতুন কোন চমক দেখাবেন না। কাজ করুন। দেশবাসী চেয়ে আছে।
(রাজনীতিকে অনেকে আন-প্রোডাক্টিভ বললেও আমি তা মনে করি না। আমার কাছে রাজনীতিও প্রোডাক্টিভ। রাজনীতির প্রোডাক্শন হল সুশাসন। কবির ভাষায় “সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা” তাই রাজনীতিকে “চাষাবাদ” এবং রাজনীতিবিদকে চাষী উল্লেখ করেছি )।
লেখক: শিক্ষার্থী, এমএসএস, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
asiskhan1983@yahoo.com









আপনার পক্ষে যদি প্রতিদিন এই সাইটে আসা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি আমাদের
এই লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন!