গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ : কয়েকটি পরামর্শ
নিজাম উদ্দিন মাহমুদ
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি নৈরাজ্য বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী এবং সারা বিশ্বের জনগণ দেখতে
পেয়েছে। কীভাবে আমাদের দেশের প্রধান রপ্তানিখাত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করা হয়েছে। চোখের সামনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত পোষাক ও কাচামাল। মালিক যেমনিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তেমনি রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক আজ বেকার। মা-বাবা, বৌ-বাচ্চা নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে নিদারুন কষ্টে জীবন যাপন করছে তারা। গার্মেন্টস কর্মীদের নামে যে নৈরাজ্য সংঘঠিত হলো সেই আন্দোলনের সময় গার্মেন্টস কর্মীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন দাবি নিয়ে আন্দোলনের কোন ব্যাপারই ছিলনা। এমনকি এই আন্দোলনে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় নব্বই শতাংশ মহিলার কেউই ছিলনা এবং পুরুষদের অধিকাংশই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি। ভাংচুরে অংশগ্রহণ করেছিল বহিরাগত কিছু যুবক। আর খোলা গার্মেন্টস ছাড়াও বন্ধ গার্মেন্টস, ঔষধ, সিরামিক, ব্লেড, প্লাস্টিক, পানীয়সহ অন্যান্য শিল্প কারখানাতে কেন হামলা করা হয়েছে? যে সকল গার্মেন্টসে যথাযথভাবে বেতন দেওয়া হয় সেখানেইবা কেন হামলা করা হল? নিজেদের কর্মক্ষেত্র শ্রমিকরা নিজহাতে এভাবে ধ্বংস করতে পারেনা কারণ ফ্যাক্টরী ধ্বংস হয়ে গেলে শ্রমিকরা চাকুরি করবে কোথায়, চলবে কিভাবে? সুতরাং আন্দোলনের নামে যে নৈরাজ্য হয়েছে তা গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্প, অর্থনীতি, উন্নতি ও অগ্রগতির বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত নৈরাজ্য। এ জাতীয় হামলা শুধু আশুলিয়া নয় বেশ কিছু দিন থেকে থেমে থেকে গাজীপুর, সাভার, মিরপুর, নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ঘটতে দেখা যায়।
এসকল ঘটনার পিছনে সত্যিই শ্রমিকদের কোন স্বার্থ থাকলে তার সমাধান নিশ্চয়ই ধ্বংসলীলার মাধ্যমে নয়। সেরকম কিছু হলে অবশ্যই মালিকপক্ষকে কঠিন জবাবদিহিতার মধ্যে আনা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যথার্থ পদক্ষেপ অতিসত্ত্বর নেয়া উচিৎ। কিন্তু মালিকের দুর্ব্যবহার এবং শ্রমিকের অধিকার বঞ্চনার ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অন্য কেউ সুযোগ নিচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। পাশ্ববর্তী একটি দেশ বাংলাদেশের বাজারে ক্রিম, টুথপেস্ট, ব্রাশ, শাড়ী, তৈল, চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন, মুরগি, গরুসহ প্রায় সবগুলো বাণিজ্যিক দিক দখল করে নিয়েছে। কিছুটা বাকি আছে শুধু পোষাকের ক্ষেত্রে। এখন সেই জায়গাটা দখল করার জন্যই তাদের এজেন্টদের দিয়ে এই ধ্বংসলীলা চালাতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। আইন শৃংখলা বাহিনী ও র্যাবের তদন্তে সেই বিষয়টি ধরা পড়েছে বলে র্যাব বলেছে। দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার অনৈতিক কাজে কারা অর্থ, বুদ্ধি, লোকবল, সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে তাদের বের করে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দিতে হবে। ইতিপূর্বেও এহেন জঘন্য ঘটনা ঘটার পর চিহ্নিত অপরাধীদের কোন শাস্তি না হওয়ার কারণেই পুনরায় ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। দেশবাসী এহেন ধ্বংসাত্বক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ঘৃনাভরে প্রত্যাখান করেছে। আমরা এই ধ্বংসলীলার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
গার্মেন্টস শিল্পের সমস্যা সমাধানে মালিক ও সরকারের প্রতি কতিপয় আহ্বানঃ ১. যারা এই সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের পরিচয় দেশবাসীর নিকট তুলে ধরে তাদেরকে এমন কঠিন শাস্তি দিতে হবে যেন আর কেউ কখনো সন্ত্রাসী কাজে না আসে।
২. প্রয়োজনে শিল্প এলাকায় লেবার কোর্ট বসিয়ে দ্রুত তাদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
৩. ইন্ডাস্টিয়াল পুলিশ বাহিনী গঠন করে শিল্প কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করা যেতে পারে।
৪. শিল্প কারখানা তৈরির সময় এমনভাবে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে যেন নৈরাজ্যকারীরা সহজেই ধবংসলীলা চালাতে না পারে।
৫. এছাড়া শিল্প এলাকার মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে।
৬. প্রত্যেক কারখানায় সিসিটিভির মাধ্যমেও কিছুটা সফলতা আসতে পারে।
৭. এছাড়া সম্ভাব্য দুষ্কৃতিকারী ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে কাজ করার জন্য আলাদা গোয়েন্ধা ইউনিটও গঠন করা যেতে পারে।
এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে হয়ত কিছুটা সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। অবশেষে গার্মেন্টস মালিকসহ যারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তাদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা এবং এই ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো যেন পুনরায় তাদের ফ্যাক্টরি চালু করতে পারেন সেজন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার জন্য সরকার ও ব্যাংকসমুহের প্রতি আহ্বান রইল। এছাড়া নিরীহ শ্রমিক যারা কোন অপরাধের সাথে জড়িত না থেকেও এখন তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে তাদের ব্যাপারেও মালিক অথবা সরকারের পক্ষ থেকে কোন একটা যৌক্তিক সমাধান করা উচিৎ বলে মনে করছি। যেমন- অন্তত ক্ষিতগ্রস্থ শ্রমিকদের জন্য রেশন চালু করা, অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়া, আংশিক অগ্রিম বেতন দেয়ার ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।
লেখকঃ মানবাধিকার কর্মী ও এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।









আপনার পক্ষে যদি প্রতিদিন এই সাইটে আসা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি আমাদের
এই লেখা সম্পর্কে আপনার মতামত দিন!